বাংলাদেশ জন্মের ৫০ বছর পেরিয়ে গেছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মের শততম বছর অর্থাৎ মুজিব জন্মশত বার্ষিকী পালন করছে দেশটি। এই বছর অর্থাৎ ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করছে দেশটি। আবার বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশ প্রাপ্ত হয়েছেন। দেশটি সংগ্রাম করে অনেক কিছু অর্জন করেছে। এতসব অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে নন-এমপিও শিক্ষকদের মানবেতর জীবন-যাপন।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী বছরেও এসে শুনতে হয় সংসার চালাতে না পেরে নন-এমপিও শিক্ষকদের আত্মহত্যার কথা। শিক্ষক নাকি জাতি গঠনের কারিগর ? সেই জাতি গঠনের কারিগর টাকার অভাবে সংসারের যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে না পেরে আত্মহত্যা করছে। কি অপরাধ এই মানুষগুলোর ? জাতির কর্ণধারদের বা সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কোন কোন ব্যক্তি এই প্রশ্নগুলোর জবাব দেবে বা এসবের দায়ভার নেবে ?

বর্তমানে মহামারী করোন ভাইরাসের দ্বিতীয় ধাপের আক্রমনের কারণে সারা বিশ্ব স্তম্ভিত ভীত হয়ে থেমে আছে। বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম নয়। মৃত্যুর মিছিলে যোগ হচ্ছে প্রতিদিন নতুন নতুন নাম। মানুষ অসহায় হয়ে লকডাউনের কারণে ঘরে বন্দি। কাজ নেই কর্ম নেই আয় ইনকামের পথ বন্ধ। এই পরিস্থিতির মধ্যে সবচাইতে বেশি বিপাকে পড়েছে নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা।

নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোন বেতন ভতা নেই। কিছু কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সামান্য কিছু টিউশন ফি আদায় করত তাই দিয়েই শিক্ষকদের সামান্য বেতন হতো। আবার কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো টিউশন ফি আদায় হতো না। সে সকল প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসতো শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাতো এবং খালি হাতে অর্থাৎ বেতন ভাতা ছাড়া বাসায় চলে যেত। বিশেষ করে নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের কোচিং বা প্রাইভেট পড়ানোর উপর তাদের সংসার চালাত।

মহামারী করোনা ভাইরাসের কারণে প্রায় পনের মাস ধরে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়ানো বন্ধ এর ফলে নন এমপিও শিক্ষকদের আয় ইনকাম বন্ধ। করোনা ভাইরাস এর দুর্যোগকালীন সময়ে সরকার মাত্র এক বার প্রণোদনা প্রদান করেছেন নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের। শিক্ষকরা তাদের সামাজিক মর্যাদার কথা চিন্তা করে কারো কাছে কিছু সাহায্য চাইতে পারছেন না বা কোন লাইনে দাঁড়িয়ে অন্য কোন সহায়তা নিতেও পারছেন না। তারা একেবারেই অসহায় হয়ে পড়েছে। শিক্ষকদের সংসার চালানোই কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ অবস্থায় মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষক অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করছেন, কেউ মৌসুমী ফল বিক্রেতা, কেউ নৌকার মাঝি, কেউ তরকারি বিক্রেতা, কেউবা আবার অটোরিকশা চালাচ্ছেন। নাটোর জেলার নলডাঙ্গা উপজেলার বাঁশিলা মাধ্যমি বিদ্যালয়ের শিক্ষক আবুল হাকিম বলেন, আমি দীর্ঘ ২১ বছর ধরে বেতন ছাড়া চাকরি করছি। বেতন ছাড়া চাকরির যে কি জ্বালা তা কেবল আমিই বুঝি।

বৃদ্ধ পিতা-মাতার মুখে দু,বেলা দু,মুঠো ভাত দেওয়ার জন্য বাদ্ধ হয়ে তরকারির দোকান দিয়েছি। এর চাইতে কষ্টের আর কি হতে পারে। সোনাপাতিল দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক মোঃ আজিজুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন যাবৎ বিনা বেতনে চাকরি করছি। স্ত্রী ছেলেদের ঠিকমত দু’বেলা দু’মুঠো খাবার ও পোশাক দিতে পারি না। আমি বাধ্য হয়ে সংসার চালানোর জন্য রং মিস্ত্রীর কাজ করছি এর চাইতে কষ্টের আর কি হতে পারে। আমরা নন এমপিও শিক্ষক বলে সমাজে আমাদের কোন মূল্য নেই । আমরা বেতন পাইনা বলে আমাদের কেউ ভালো ভাবে দেখে না ।

কি অসহায় ভাবে সংসার চালাই সেটা কেবল আমিই জানি। নলডাঙ্গা বি এম কলেজের শিক্ষক মাহমুদুল হাসান ফকির মুক্তা বলেন, আমার এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মতন চাকরির সকল বিধান মেনেই নিয়োগ পেয়েছি এবং চাকরি করছি। তবে কি অপরাধ আমাদের আমার বেতন পাব না ? শিক্ষার্থীদের পাঠদানের পর মাসের শেষে এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা যখন বেতন পায় তখন আমাদের কষ্টের সীমা থাকে না। আমাদের কষ্ট কেবল আমারই বুঝি, এটা বলে বোঝানো যাবে না। আমরা নিষ্ঠার সাথে শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করছি। সরকার একদিন আমাদের এমপিওভুক্ত করবেন আমরা বেতন-ভাতা পাব এই আশায়।

আশা নিয়েই মানুষ বেঁচে থাকে। এই আশাতেই আমরা চাকরি করে যাচ্ছি। মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকদের এই মানবেতর জীবনযাপন সম্পর্কে নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের নলডাঙ্গা উপজেলা নেতৃবৃন্দ বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করছে। কিন্তু এখনও বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নন-এমপিও আছে। এর চেয়ে কষ্টের ও লজ্জার আর কি হতে পারে ? বর্তমার সময়ে নন-এমপিও শিক্ষকদের পরিবার নিয়ে টিকে থাকা অত্যান্ত কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তাই নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো অতি তাড়াতাড়ি এমপিওভুক্ত করে সমাজে শিক্ষকদের মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সহানুভূতি কামনা করছি।