যাঁরা প্রবাসে আছেন, তাঁদেরও আয় কমে গেছে। করোনাভাইরাস বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই কমবেশি আঘাত হেনেছে। যে কারণে অনেক প্রবাসী শ্রমিককে দেশে ফিরতে হয়েছে। এরপরও সদ্য বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয়ে যেন জোয়ার এসেছে। দুই হাতে বৈধ চ্যানেলে দেশে অর্থ পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।

বিদায়ী অর্থবছরে দেশে সব মিলিয়ে প্রবাসী আয় এসেছে ২ হাজার ৪৭৭ কোটি ৭৭ লাখ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮৫ টাকা ধরে)। এই আয় এর আগের ২০১৯-২০ অর্থবছরের ১ হাজার ৮০৩ কোটি ১০ লাখ ডলারের চেয়ে ৩৬ শতাংশ বেশি এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরের তুলনায় দ্বিগুণ। এদিকে বিদায়ী অর্থবছরে পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে মোট আয় হয়েছে ৩ হাজার ৮৭৬ কোটি ডলার। অর্থাৎ প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ রপ্তানি আয়ের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে।

পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত ১ বছরে প্রবাসীদের পাঠানো মোট অর্থ দিয়ে দেশে ৭টি পদ্মা সেতু বানানো সম্ভব। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী পদ্মা সেতু তৈরিতে ব্যয় হবে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা।

প্রবাসী আয় বৃদ্ধির কয়েকটি কারণ ব্যাখ্যা করেছেন ব্যাংকার ও এক্সচেঞ্জ হাউসের কর্মকর্তারা। তাঁরা বলছেন, বৈশ্বিক যোগাযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে অবৈধ চ্যানেল বা উপায়ে (হুন্ডি) অর্থ পাঠানোও একেবারে কমে গেছে। অন্যদিকে বৈধ পথে রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়) পাঠালে ২ শতাংশ প্রণোদনা মিলছে। ফলে প্রবাসীরা বৈধ পথে অর্থ পাঠানোয় মনোযোগ দিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসীরা গত অর্থবছরের শেষ মাস জুনে দেশে মোট ১৯৪ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন, যা দেশের প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকার মতো। গত বছরের একই মাসে তাঁরা ১৮৩ কোটি ডলার পাঠিয়েছিলেন।

প্রবাসী আয় বৃদ্ধির বৈশ্বিক কোনো কারণ নেই। বেড়েছে দেশীয় কারণে। সেটা হলো অবৈধ চ্যানেল বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে সরকার ২ শতাংশ প্রণোদনা দিচ্ছে। এ কারণে যাঁরা আয় পাঠাচ্ছেন, সবই বৈধ পথে আসছে। প্রকৃতপক্ষে করোনায় আয় আসা কিন্তু কমেছে।

করোনার কারণে মানি চেঞ্জারদের ব্যবসা শেষ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার তারা জেগে উঠবে। তখন বৈধ পথে আয় আসা হঠাৎ কমে যাবে। এ জন্য এখন থেকে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, অনেক শ্রমিক চলে এসেছেন। আবার যাওয়াও কমে গেছে।

করোনার মধ্যে প্রবাসীদের পাঠানো আয় দেশের অর্থনীতিতে বড় স্বস্তি এনে দিয়েছে। এর ফলে দেশের ব্যাংকগুলোতে আমানত বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা মজুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রামীণ জনপদে থাকা প্রবাসীদের স্বজনেরা করোনার আর্থিক প্রভাব থেকে রেহাই পাচ্ছেন। এদিকে রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি প্রবাসী আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা মজুত নতুন উচ্চতায় উঠেছে। গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৪৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ৬৪২ কোটি ডলার। এর আগে গত মে মাসের শুরুতে রিজার্ভ ৪৫ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে বিদেশ থেকে সর্বোচ্চ ৭৪৫ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে ইসলামি ব্যাংকের মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে অন্য উল্লেখযোগ্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে অগ্রণী ব্যাংক ২৮২ কোটি ডলার, ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক ২৪৯ কোটি ডলার, সোনালী ব্যাংক ১৫২ কোটি ডলার ও ব্যাংক এশিয়া ৯৭ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় এনেছে।

প্রবাসী আয় আনয়নে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর এগিয়ে থাকা প্রসঙ্গে ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রবাসী আয় সংগ্রহে আমরা বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক বাড়িয়েছি। আর বিতরণের জন্য দেশের ভেতরে চ্যানেল প্রতিনিয়ত বাড়ানো হচ্ছে। এজেন্ট ব্যাংকিং ইউনিয়নে ও গ্রামে পৌঁছে গেছে। এর ফলে আয় সংগ্রহে কাউকে দূরে যেতে হচ্ছে না। এ কারণে ব্যাংক এশিয়ার মাধ্যমে আয় আসা বেড়েছে।’

২০১৯-২০ অর্থবছরে সরকার দেশে প্রবাসী আয় পাঠানোর বিপরীতে ২ শতাংশ প্রণোদনা প্রদানের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই বৈধ পথে প্রবাসী আয় বাড়তে শুরু করে। কোনো কোনো ব্যাংক ও বিকাশ সরকারের ২ শতাংশ প্রণোদনার সঙ্গে বাড়তি ১ শতাংশ দিচ্ছে। ফলে অবৈধ পথে প্রবাসী আয় পাঠানো কমে যায়। করোনার মধ্যে প্রবাসী আয়ে বড় ধরনের ধাক্কা লাগার আশঙ্কা করা হলেও বাস্তবে তা ঘটেনি। বরং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সীমিত হয়ে পড়ায় বৈধ পথে প্রবাসী আয় পাঠানোর পরিমাণ বেড়েছে।

করোনার মধ্যেও প্রবাসী আয় অর্জনে বাংলাদেশ আরও এক ধাপ এগিয়েছে। নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের মধ্যে প্রবাসী আয় অর্জনে বাংলাদেশ ৭ম অবস্থানে উঠে এসেছে।